ছোট দেশ, বড় দাবার গল্প
ঢাকা, চট্টগ্রাম বা রাজশাহীর কোনো দাবাপ্রেমীকে জিজ্ঞেস করলে প্রায়ই কয়েকটা নাম শুনবেন: নিয়াজ মোরশেদ, রানী হামিদ, জিয়াউর রহমান। বিশ্বের বড় দাবা-দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম সাধারণত আসে না। অথচ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার এসেছেন এই দেশ থেকেই। এসেছেন এমন একজন নারী খেলোয়াড়, যিনি কয়েক দশক ধরে খেলে গেছেন। আর এসেছেন একদল গ্র্যান্ডমাস্টার, যাঁরা বছরের পর বছর জাতীয় দলকে টেনে নিয়ে গেছেন।
এই লেখায় সেই গল্পের কিছুটা থাকল। শেষে থাকল কিছু সহজ পরামর্শ, যাঁরা নতুন করে শুরু করতে চান তাঁদের জন্য।
নিয়াজ মোরশেদ: দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার
গ্র্যান্ডমাস্টার হলো বিশ্ব দাবা সংস্থা FIDE-এর দেওয়া সবচেয়ে বড় আজীবন খেতাব। 1987 সালে নিয়াজ মোরশেদ এই খেতাব পান। তিনি হলেন বাংলাদেশের প্রথম, আর পুরো দক্ষিণ এশিয়ারও প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার। ভারতের মতো বড় দাবা-দেশও তাদের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার পেয়েছে এর পরের বছর।
তাঁর এই সাফল্য একটা পুরো প্রজন্মকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে বিশ্বমানের দাবা আমাদের নাগালের বাইরে নয়। ক্লাব, স্কুল, পত্রিকার দাবা কলাম, সব জায়গায় এর ছাপ পড়েছিল।
রানী হামিদ: পথ দেখানো মানুষ
নিয়াজ মোরশেদ দেখিয়েছিলেন কী সম্ভব। রানী হামিদ দেখিয়েছেন লেগে থাকা কাকে বলে। যখন এ অঞ্চলে খুব কম নারী টুর্নামেন্টে দাবা খেলতেন, তখনই তিনি খেলা শুরু করেন। এরপর কয়েক দশক ধরে বহুবার জাতীয় মহিলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ব্রিটিশ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছেন একাধিকবার। দাবা অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন অনেক লম্বা সময় ধরে, এমন বয়সেও, যখন বেশিরভাগ খেলোয়াড় অবসর নিয়ে ফেলেন।
আজ যে মেয়েরা দাবা খেলে, তাদের অনেকের কাছেই রানী হামিদ একটা ভরসার নাম। তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, দাবায় বয়সের কোনো সীমা নেই। সাত বছর বয়সেও শেখা যায়, সত্তরেও।
জিয়াউর রহমান: জাতীয় দলের ভরসা
জিয়াউর রহমান 2002 সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার হন। বিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী আর সক্রিয় খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন। বহুবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, অলিম্পিয়াডে খেলেছেন বাংলাদেশের প্রথম দিকের বোর্ডে।
তিনি কোচও ছিলেন, আর টুর্নামেন্ট হলে ছিলেন খুব চেনা মুখ। 2024 সালের জুলাইয়ে ঢাকায় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা চলার সময়েই তিনি মারা যান। খবরটা দেশের দাবা অঙ্গনের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
এনামুল হোসেন রাজীব ও গ্র্যান্ডমাস্টারদের প্রজন্ম
2000-এর দশকে আরও কয়েকজন গ্র্যান্ডমাস্টার আসেন। রিফাত বিন সাত্তার আর আবদুল্লাহ আল রাকিব খেতাব পান, আর 2008 সালে গ্র্যান্ডমাস্টার হন এনামুল হোসেন রাজীব। এর ফলে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের সেই অল্প কয়েকটা দেশের একটা হয়ে ওঠে, যাদের একসাথে কয়েকজন সক্রিয় গ্র্যান্ডমাস্টার ছিলেন।
তাঁদের সবার পথ আলাদা, কিন্তু মিলও আছে: বছরের পর বছর বোর্ডে বসে টুর্নামেন্ট খেলা, নিজের গেম মন দিয়ে রিভিউ করা, আর দাবাকে সিরিয়াসলি নেওয়া।
আমাদের রোজকার দাবা
গ্র্যান্ডমাস্টাররা তো চূড়া। আসল দাবা চলে আরও অনেক জায়গায়:
- ক্লাব আর ফেডারেশন। বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ আর রেটিং টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। অনেক শহরের ক্লাবও নিজেদের টুর্নামেন্ট চালায়।
- স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকে প্রথম ঘড়ি আর স্কোরশিট নিয়ে খেলে স্কুল বা ভার্সিটির টুর্নামেন্টে।
- চায়ের দোকান আর উঠান। অনেকের শেখা শুরু বাড়ির পুরোনো বোর্ডে বা পাড়ার চায়ের দোকানে, চারপাশে না-চাওয়া পরামর্শের ভিড়ের মধ্যে।
- অনলাইন। এখন অনেক খেলা হয় মোবাইলে, বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। দ্রুত গেম মজার, তবে ভুলগুলো কখনো ফিরে না দেখলে খারাপ অভ্যাসও তৈরি হয় সেখানেই।
কীভাবে শুরু করবেন
একদম নতুন হোন বা ছোটবেলায় খেলে থাকুন, এই সহজ পথটা ধরে এগোতে পারেন।
1. চালগুলো ঠিকঠাক শিখুন
ক্যাসলিং, আঁ পাসঁ (en passant), প্রমোশন, আর চেকমেট আর স্টেলমেটের পার্থক্য: এই নিয়মগুলো অনেকেই ভুল জানেন। আমাদের "গুটি কীভাবে চলে" লেখায় এগুলো ধাপে ধাপে বলা আছে।
2. একটু ধীরে খেলুন, তারপর রিভিউ করুন
এক মিনিটের গেমের চেয়ে দশ মিনিট বা তার বেশি সময়ের গেম থেকে অনেক বেশি শেখা যায়। প্রতিটা গেমের পর গেম রিভিউ-তে খুলে দেখুন কোন চালে পাল্লা ঘুরে গেল। প্রতি গেম থেকে একটা শিক্ষাই যথেষ্ট।
3. ওপেনিং শিখুন তার আইডিয়া ধরে
লম্বা লাইন মুখস্থ করার দরকার নেই। 1.e4-এর বিরুদ্ধে একটা আর 1.d4-এর বিরুদ্ধে একটা ওপেনিং বেছে নিন, আর বুঝুন চালগুলো কেন খেলা হয়। ওপেনিং ট্রেনার-এ বারবার প্র্যাকটিস করতে পারবেন।
4. প্রতিদিন পাজল সমাধান করুন
দিনে দশ মিনিট পাজল প্যাটার্ন চেনার ক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ায়, অন্য কিছু তত দ্রুত বাড়ায় না। ক্লাব লেভেলের বেশিরভাগ গেমের ফল ঠিক হয় একটা মিস হয়ে যাওয়া ট্যাকটিক দিয়ে।
5. ক্লাবে যোগ দিন, টুর্নামেন্ট খেলুন
একই মানুষদের সাথে নিয়মিত খেললে বোঝা যায় আপনি কতটা এগোলেন। chessGM ক্লাব-এ যোগ দিন বা নিজেই একটা খুলুন, আর চাপের মধ্যে খেলার অভ্যাস করতে টুর্নামেন্ট-এ নাম লেখান। প্রস্তুত হলে ফেডারেশন আর স্থানীয় ক্লাবের রেটিং টুর্নামেন্ট খুঁজে নিন।
6. বিখ্যাত গেমগুলো দেখুন
অপেরা গেম বা ইমমর্টাল গেমের মতো ক্লাসিক গেম ডেভেলপমেন্ট আর আক্রমণ যত পরিষ্কারভাবে শেখায়, অনেক বইও তা পারে না। অ্যানালাইসিস বোর্ড-এ চালগুলো খেলে দেখুন, বা ভিডিও দেখুন।
সামনের অধ্যায়
আমাদের গ্র্যান্ডমাস্টাররা অনেক কম সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এতদূর এসেছেন। আজ সিলেট বা খুলনার একজন ছাত্র মোবাইলেই ইঞ্জিন দিয়ে গেম রিভিউ করতে পারে, ওপেনিং প্র্যাকটিস করতে পারে, সারা পৃথিবীর মানুষের সাথে খেলতে পারে। প্রতিভা এখানে সবসময়ই ছিল। পরের বাংলাদেশি গ্র্যান্ডমাস্টার হয়তো এখনই কোথাও খেলছে, একটা একটা করে গেম।
প্রকাশ 2026-11-01 · 22Softwares